জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব

সরকার অতিরঞ্জিত বললেও খুঁজে পাচ্ছে না বিবিএস

দেশের সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির তথ্যে নেই বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। সম্প্রতি ক্ষমতার পালাবদলের পর এ প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে।

দেশের সরকারি পরিসংখ্যান দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির তথ্যে নেই বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। সম্প্রতি ক্ষমতার পালাবদলের পর এ প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে। দেশী-বিদেশী বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও জিডিপির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বলা হয়েছে, উন্নয়নের বয়ান তৈরির জন্য জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল বিগত সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পর গতকাল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত অর্থবছরের জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেছে। তাতে অবশ্য বিগত সময়ের তথ্যের সঙ্গে খুব বেশি ফারাক নেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গলদ রয়েছে বিবিএসের জিডিপির হিসাব পদ্ধতির মধ্যেই। অনুমাননির্ভর এবং অনেক পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করে সরকারের সংস্থাটি। ফলে অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এবারো পদ্ধতিগত কোনো পরিবর্তন না করার কারণেই জিডিপির হিসাবে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন তারা। তাই বিবিএসের সামগ্রিক পরিবর্তনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ বিশ্লেষকদের।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ‘সিজি মডেল’ নিয়ে কাজ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বজলুল হক খন্দকার। বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান তৈরির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘জিডিপিতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের মতো একটি গ্যাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। এতে জিডিপির আকার ৪০০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসতে পারে। কেউ কেউ ৩০০ বিলিয়ন ডলার বলছেন। তবে তা এতটা কম হওয়ার কথা না।’

বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশনা বলছে, দেশের জিডিপির আকার গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। যদিও সংস্থাটির গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত সাময়িক হিসাবে ৪৫৯ বিলিয়ন ডলার বলা হয়েছিল। অর্থাৎ চূড়ান্ত হিসাবে জিপিডির আকার কমেছে মাত্র ৯ বিলিয়ন ডলার। টাকার হিসাবে দেশের জিডিপির আকার এখন ৫০ লাখ কোটি টাকার ওপর।

দেশী-বিদেশী বিভিন্ন নথিতে পাওয়া তথ্য এবং অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে যদিও বাংলাদেশের জিডিপির প্রকৃত আকার ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ও উন্নয়নকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে গিয়েই মূলত বিগত সরকার দেশের জিডিপি পরিসংখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও এসব পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল প্রথম দিকে। কিন্তু এসব নিয়ে কোনো কাজ না করে উল্টো আগের ধারায় জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠনের পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতের অবস্থা নিরূপণের জন্য গঠন করে শ্বেতপত্র কমিটি। দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা তিন মাস বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে একটি প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনেও পরিসংখ্যান কারসাজির মাধ্যমে বিগত সময়ে উন্নয়নের বয়ান তৈরির অভিযোগ আনা হয়। এতে বলা হয়, ২০১০-১৯ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো হলেও কীসের ভিত্তিতে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। এমনকি একটি মডেলে ২০১৩ সালের পর থেকে দেশের প্রবৃদ্ধি নামতে থাকলেও সরকার ঘোষিত সে হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধির উপস্থাপিত তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার এমন ব্যবধান বেড়েই চলেছিল।

শ্বেতপত্র কমিটির সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান। এ বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিবিএসের জিডিপি হিসাবের পদ্ধতি নিয়ে আমরা প্রতিবেদনে সমালোচনা করেছি। তাদের হিসাবের বড় অংশের সঙ্গে বাস্তবিক তথ্যের মিল থাকে না। অনেক অনুমিত ও পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে। রাতারাতি এসব পদ্ধিতগত পরিবর্তন করার সক্ষমতা হয়তো তাদের নেই। আর সে সময়ও হয়তো তারা পায়নি। তাই তাদের জিডিপির তথ্যের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। এসব সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কিন্তু বিবিএসের সামগ্রিক পরিবর্তনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ আমরা দেখছি না।’

বিবিএসের তথ্যমতে, চূড়ান্ত হিসাবে রফতানি আয় কমেছে ২১ শতাংশ। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮২ থেকে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে। সবচেয়ে বেশি পার্থক্য দেখা গেছে শিল্প প্রবৃদ্ধিতে। সাময়িক হিসাবে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বলা হলেও চূড়ান্ত হিসাব বলছে, শিল্প প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জিডিপির হিসাব পরিবর্তন করতে হলে সরকারকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা জিডিপির ঐতিহাসিক তথ্যগুলো খতিয়ে দেখতে চাই। তখন এসব নিয়ে অনেক টেকনিক্যাল কাজ করতে হবে। সময় সাপেক্ষ ব্যাপার এটা। আর সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়ও এখানে জড়িত। কাজগুলো বিবিএসের মাধ্যমেই করতে হবে।’

জিডিপির আকার কমে আসায় চূড়ান্ত হিসাবে মাথাপিছু আয়ও কমে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৭৩৮ মার্কিন ডলার। সাময়িক হিসাবে ছিল ২ হাজার ৭৮৪ ডলার। তিন অর্থবছর ধরেই দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৭৯৩ ডলার, যা এ-যাবৎকালের সর্বোচ্চ। তবে টাকার হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, যা ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ৩ লাখ ৪ হাজার ১০২ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬০ টাকা।

এর আগে ২০২২ সালে ‘কান্ট্রি ইকোনমিক মেমোরেন্ডাম: চেঞ্জ অব ফ্যাব্রিক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এতে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত হার ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে ১০ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। বাড়তি এ প্রবৃদ্ধি বাদ দিলে মূলত জিডিপির আকার দাঁড়ায় ৩২২ বিলিয়ন ডলারে।

অন্যদিকে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্সেসের হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপির আকার ছিল প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকটির ‘‌ম্যাক্রোইকোনমিক আউটলুক ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে অর্থনৈতিক উৎপাদনের তুলনা করে জিডিপির এ হিসাব করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ফোনে কয়েক দফা চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য নেয়াও সম্ভব হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বিবিএসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে তিনিও যুক্ত ছিলেন।

বিবিএসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সময়ের পরিসংখ্যান নিয়ে আমরা কোনো কথা বলতে পারব না। তবে আগামীতে জিডিপির হিসাব রিভাইস করার একটি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ১০ বছর পর পরই এটা করা হয়। ভিত্তিবছর পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজটি করা হবে।’

আরও